Get Even More Visitors To Your Blog, Upgrade To A Business Listing >>

অভিশপ্ত ব্লু হোয়েল : উত্তরণ কোন পথে

গত ক’দিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় “ব্লু হোয়েল” নামক একটি সুইসাইড গেম নিয়ে তোলপাড় চলছে। খবরের কাগজেও শিরোনাম হচ্ছে।

প্রতিদিনই আসক্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে। দুয়েকটা মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। ভারত ও রাশিয়ায় ব্লু হোয়েলে মৃতের সংখ্যা দু’শর কাছাকাছি। বাংলাদেশের একটি পাবলিক ভার্সিটিতে ব্লু হোয়েল আসক্ত ৫ ছাত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। গত ৫ অক্টোবর রাজধানীর সেন্ট্রাল রোডের একটি বাসায় ব্লু হোয়েল দংশনে অপূর্বা বর্মন স্বর্ণা (১৩) নামের এক কিশোরীর আত্মহত্যার খবর ছিল টক দ্যা কান্ট্রি। ভারতের উত্তর প্রদেশের হামিরপুরে ক্লাস সিক্সের এক ছাত্র গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। যখন তার ঝুলন্ত লাশ নামানো হচ্ছিল, তখন তার মোবাইলে ব্লু হোয়েল চলছিল। এটা বিজ্ঞান ও প্রুযুক্তির আশীর্বাদ নয়-  অভিশাপ। এ উদ্ভাবন আত্মঘাতী, জীবননাশী।

২০১৩ সালে “এফ ৫৭” নামে এ গেমের যাত্রা শুরু। ফিলিপ বুদেকিন নামক জনৈক রুশ যুবক এ গেমের উদ্ভাবক। সে মনোবিজ্ঞানের ছাত্র ছিল। পরে তাকে ভার্সিটি থেকে বহিষ্কার করে দেয়া হয়।

সে এ সুইসাইড গেম উদ্ভাবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছে- ‘সমাজে যাদের কোনো গুরুত্ব নেই, যারা হতাশ- পৃথিবীতে তাদের বেঁচে থাকবার অধিকার নেই। তাদেরকে আত্মহননে প্ররোচনা দেয়ার মাধ্যমে সমাজকে পরিষ্কার করার জন্য এটা করা হয়েছে। ‘
ব্লু হোয়েল গেমের ৫০ টি ধাপ। সম্পূর্ণ করতে সময় লাগে ৫০ দিন। প্রতিটি ধাপ শেষে সে গেমের ছবি কিউরেটরকে পাঠাতে হয়। তাতে গেমারকে দুঃসাহস প্রদর্শন করতে ও নানা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে প্ররোচিত করা হয়। সেটা না করলে ভর্ৎসনা করা হয় অথবা নানাভাবে কঠিন হুমকি প্রদান করা হয়। বেশিরভাগ সদস্যই গেমের শেষ ধাপে যেতে পারে না। তার পূর্বেই আত্মহত্যা করে। কেউ যদি শেষ ধাপে পৌঁছতে সক্ষম হয়, ওই শেষ ধাপেই কিউরেটর তাকে আত্মহত্যা করতে পরিষ্কার নির্দেশ দেয়। আর গেমার মন্ত্রমুগ্ধের মত তার নির্দেশ মেনে নির্মম আত্মহননের পথ বেছে নেয়।

ফিলিপ বুদেকিন মানুষ মারার জন্য এটা কেন উদ্ভাবন করলেন? গুরুত্বহীন হতাশ যারা, পৃথিবীতে তাদের বাঁচার অধিকার নেই। এ অধিকারের মালিক কি তিনি? অধিকার কি তার কাছ থেকে চেয়ে আনতে হবে? তিনি কি মানুষের জীবন দিয়েছেন? যে জীবন দিতে পারে, সময়মত সে নিতেও পারে। এটা স্রষ্টার নিরঙ্কুশ অধিকার। কোনো মানুষের এ অধিকার নেই। তবে স্রষ্টার বিধানে কারো প্রাণদণ্ড বিধিবদ্ধ হলে স্রষ্টার আইনে জীবন নাশ করা যেতে পারে। যদি সে দেশে স্রষ্টার আইন বলবৎ থাকে। যেমন বিভিন্ন দেশের আইনে প্রাণদণ্ডের বিধান রয়েছে। এটা ভিন্ন কথা। এছাড়া একটা মানুষ সমাজে গুরুত্ব হারাল বা হতাশ হয়ে গেল, আর কেউ বলল- তার আর বাঁচার অধিকার নেই। তাকে আত্মহননে প্ররোচনা দিয়ে মেরে ফেলা হল। এটা কোনো মানুষের বিবেক যেমন সায় দিতে পারে না, তেমনি সমর্থনও করতে পারে না। যে সায় দিবে বা সমর্থন করবে, আমরা বলব- সে তার মনোজগতে কোনো মনুষ্যবিবেক লালন করে না। সে মনুষ্যত্ব ও মানবতাবঞ্চিত। ফিলিপ বুদেকিন মনোবিজ্ঞানে পড়ুয়া ভার্সিটির ছাত্র। শিক্ষা তাকে মানবতার পথ প্রদর্শন করেনি। তার এ সুইসাইড গেম আবিষ্কারই প্রমাণ- তার কাছে ধর্মীয় মূল্যবোধ যেমন নেই, সামাজিক মূল্যবোধও নেই। হতে পারে সে কোনো ধর্মাবলম্বি। ধর্মাবলম্বি হলেই যে ধর্মীয় মূল্যবোধ থাকতে হবে- বাস্তবতা এমনটা নয়। আজকাল বিভিন্ন ধর্মের নামসর্বস্ব ধার্মিক অনেক আছে, যারা বিশ্বাসে ও কর্মে আদৌ কোনো ধর্ম মানে না, বুঝে না এবং কোনো ধর্মীয় মূল্যবোধ লালনও করে না। ফিলিপ বুদেকিন অভিশপ্ত হয়েছে। অভিশপ্ত সুইসাইড গেম উদ্ভাবন করেছে। নিশ্চয় এটা তার ধর্মীয় মূল্যবোধহীনতারই কুফল। আমরা যতটুকু জানি, কোনো ধর্মই অন্যায় মানবহত্যাকে বৈধতা দেয় না। কর্ম ও বিশ্বাসের মাধ্যমেই মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে। কিন্তু তার অপকীর্তির মধ্যে এর কোনো আঁচ অনুভব করা যায় না। আসলেই ধর্মীয় মূল্যবোধহীন মানুষ করতে পারে না- এমন কোনো অপকর্ম নেই। তার এ পাশবিক অপকর্মে আজ শঙ্কাগ্রস্ত গোটা পৃথিবী।

এখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। বিজ্ঞানের জয়জয়কার সর্বত্র। ছেলেমেয়েদের হাতে হাতে এন্ড্রয়েড মোবাইল। এটা যোগাযোগের মাধ্যম তো নয়, একটা মিনি কম্পিউটার। কানে কানে ঝুলন্ত শোভা পায় ইয়ারফোন। মিউজিয়ামের সুর ও তালে তালে হচ্ছে আন্দোলিত। আকাশের দরোজা খোলা। অবারিত আকাশসংস্কৃতি। হিন্দি নাচগান ডিসকো সংস্কৃতি এবং পর্নোবেহায়াপনায় সয়লাব কিশোর ও যুবমানস। অন্তর্জগতে মৌজ করতে করতে সে হেঁটে যায়। খেয়ালই করে না কোনো গুরুজন বা মুরব্বিকে অতিক্রম করছে। সালাম-আদাব নেই। তোয়াজ-তোয়াক্কা নেই। মান্যতা গণ্যতা নেই। ডেমকেয়ার। উদ্যত দুর্বিনীত হাবভাব দৃশ্যমান। এ অবস্থা যাদের তারা একেবারে কাঠমূর্খ নয়। সাক্ষর, কিছু হলেও শিক্ষিত। হাই স্কুল কলেজ-ভার্সিটি ল্যাভেলে পড়ুয়া তো আছেই। সবাই যে এরকম- সে দাবি করা হচ্ছে না। তবে আশেপাশে তাকালেই এমন পরিবেশ দৃষ্টিগোচর হয়।   যুব-সমাজের এ অবস্থা কেন? এদের কি শিক্ষা-দীক্ষা নেই? মুরব্বি ও গুরুজন নেই? ধর্ম ও সমাজ নেই? ধর্মীয় মূল্যবোধ নেই?

তাদের এই যে অবস্থা- এটা শিক্ষার অভাবে নয়। এটা হলো ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কুফল বা বিষফল।

ধর্মীয় বিশ্বাস লালন এবং ধর্মচর্চায় ধর্মীয় মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। যে পরিবারে ধর্মীয় আকিদা-বিশ্বাস ঠিক নেই, ধর্মচর্চার বালাই নেই- সে পরিবারে যেমন কোনো ধর্মীয় মূল্যবোধ গড়ে ওঠে না, তেমনি তাদের প্রতিষ্ঠিত পারিবারিক শিক্ষাও ধর্মসঞ্জাত হয় না। অনুরূপ শিক্ষাক্ষেত্রেও। যে শিক্ষাকারিকুলামে ধর্মীশিক্ষার সুব্যবস্থা নেই, সেখান থেকে ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন সুনাগরিক বের হতে পারে না। আমাদের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা দেখুন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে সামান্য ধর্মশিক্ষা থাকলেও তা হল ঐচ্ছিক, অপর্যাপ্ত। স্কুলের ধর্মশিক্ষা পড়ে কেউ আজ পর্যন্ত সহি শুদ্ধভাবে নামায শিখতে পারেনি। তিলাওয়াত শিখতে পারেনি। হালাল-হালাল, পাক-নাপাক ও জায়েয-নাজায়েয শিক্ষা করা তো সুদূরপরাহত। আমাদের শিক্ষার কোনো পর্যায়েই ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক নয়। এটা ধর্মশিক্ষার প্রতি গুরুত্বহীনতা, অনীহা এবং অবহেলারই নগ্ন প্রকাশ।

গুরুত্বহীনতা, অনীহা এবং অবহেলারই নগ্ন প্রকাশ।

আমাদের ছেলেমেয়েরা-  তারা যে পর্যায়েরই শিক্ষিত হোক- শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন হয়ে গড়ে উঠতে পারে না। যে যে ধর্মেরই হোক- কেউই ধর্মীয় মূল্যবোধ মনোজগতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার শিক্ষা পায় না। দুঃখজনকভাবে তারা এ থেকে বঞ্চিত থাকে। অথচ এটা তাদের অধিকার ছিল। এ অধিকার থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। যার ফলে সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ গড়ে ওঠছে না। সমাজটা হয়ে পড়ছে অন্তঃসারশূন্য।

উদার আকাশসংস্কৃতি, পর্নোসংস্কৃতি, উলঙ্গপনা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, মদ, গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা, প্রতারণা, ব্লাকমেইল ও ব্লু হোয়েল ইত্যাদি এমন জিনিস-  ধর্মীয় মূল্যবোধ ছাড়া যার লাগাম টেনে ধরা অসম্ভব। অন্তত কঠিন তো নিশ্চয়ই। বলা হচ্ছে কাউন্সিলিং এবং অভিভাবক ও শিক্ষকদের সতর্ক তদারকির মাধ্যমে এ বিপদ কেটে যাবে। হ্যাঁ, সে কাউন্সিলিং ও সতর্ক তদারকি যদি ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে, ধর্মীয় মূলবোধের আলোকে হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে কাজে আসবে; নতুবা সকল আয়োজন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। একটা মানুষের যদি ধর্মীয় মূল্যবোধ থাকে- তথা সে যদি স্রষ্টাকে বিশ্বাস ও ভয় করে, তার শাস্তিকে ভয় করে, হালাল-হারাম বোঝে, তার আদালতে জবাদেহিতার বিশ্বাসে ভীত হয়- তাকে সহজে ফেরানো যায়। সুপথে নিয়ে আসা যায়। রোযাদার বদ্ধ ঘরে বা পানির নিচে, যেখানে কারো টের পাবার সম্ভাবনা নেই, সেখানে পানি পান করা থেকে বিরত থাকে- কার ভয়ে? কোন মূল্যবোধের কারণে? এটা গভীভাবে অনুধাবন করতে হবে।

ব্লু হোয়েল ধর্মীয় মূল্যবোধহীনতারই কুফল। ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়েরই বিষময় প্রযুক্তিক অভিশাপ। একমাত্র না হলেও ধর্মীয় মূল্যবোধই এর প্রধানতম কার্যকরী প্রতিষেধক। সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধের লালন চর্চা ও প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এ ঘোর বিপদ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এটা আমাদের বুঝতে যত দেরি হবে, ততই অমঙ্গল।



This post first appeared on Amr Bangla - 24/7 Online News Portal, please read the originial post: here

Share the post

অভিশপ্ত ব্লু হোয়েল : উত্তরণ কোন পথে

×

Subscribe to Amr Bangla - 24/7 Online News Portal

Get updates delivered right to your inbox!

Thank you for your subscription

×